পোড়া ঢেউটিন ও আমার বাংলাদেশ-২
(চলমান পাতা-২)
![]() |
| কাঁচামালের দোকান |
হঠাৎ করেই এক বিকেলে আমার বাবা মা আমার আর তিন ভাই এক বোন সিরাজগঞ্জের বাসায় এসে হাজির। বাড়িতে যেনো আনন্দের বন্যা বয়ে গেলো সবার মাঝে। আমাকে কাছে পেয়ে মা আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করে দিলেন। আমিও কান্না করে দিয়েছি সবাইকে কাছে পেয়ে। রাতে বাবার কাছে জানতে পারলাম আমাদের সৈয়দপুরের বাড়ি ঘর সব পুড়িয়ে দিয়েছে পাকিস্তানি সেনারা। সেখান থেকে কোনোমতে জীবন নিয়ে তাঁরা সৈয়দপুরের পশ্চিমে বিন্নাকুড়ি নামে এক গ্রামে বেশ কিছুদিন পালিয়ে ছিলেন। তারপর বিভিন্ন ভাবে কখনো পায়ে হেঁটে, কখনো ভ্যানে করে, কখনো রেলগাড়িতে করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রায় এক মাস পর সিরাজগঞ্জ এসে পৌঁছেছেন। আমরা যেনো সবাই প্রান ফিরে পেয়েছি। বাড়ি ভর্তি মানুষ।
আব্বা ব্যবসায়ি মানুষ। আমাদের একটা বড় মুদিখানা দোকান ছিলো। ১৯৬৫ সালের পাক ভারত যুদ্ধের সময় হঠাৎ করেই নিত্য প্রয়োজনীয় পন্যের দাম বেড়ে যায়। আব্বার দোকানে বিশেষ কোনো মালের ষ্টক ছিলো না। তাই তিনি সে সময় ব্যবসায়ে লাভবান হতে পারেন নাই। তাই যখন ৭১ সালে যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব তখন বাবার মাথায় সেই ১৯৬৫ সালের কথা মনে পড়ে যায়। তখন আমাদের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিলো। আব্বার কাছে নগদ আর ব্যাংকে যা ছিলো সব টাকা তুলে দোকানের গুদামে এবং বাড়িতে খালি ঘরে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি, বিশেষ করে কেরোসিন তেলের ড্রাম, চাল, ডাল, লবন ইত্যাদি কিনে কিনে ভরে ফেলেন। নিজের কাছে নগদ টাকা পয়সা যৎসামান্য ছিলো মাত্র। যে জানতো চাল ডাল তেল লবন বাড়ি ঘর দোকান পাট সব ছেড়ে শুধুই জীবনটা হাতে নিয়ে পালাতে হবে?
সকালে আব্বা আমাকে বললেন বাবা চলো আজকে একটু শহরে যাবো। সকালের নাস্তা সেরে আমরা সিরাজগঞ্জ শহরের দিকে রওয়ানা হলাম। আমাদের রহমতগঞ্জ গ্রাম থেকে সিরাজগঞ্জ এর বাজার প্রায় দুই কিলোমিটারের মতো হবে আর কি। আমরা দুজনে হেঁটে হেঁটে বাহিরগোলা হয়ে শহরে প্রবেশ করলাম। শহরে লোকজনের বেশ ভিড় লক্ষ্য করলাম। বড় বাজারের কাছে রাস্তার পাশে কাঁচা বাজার লেগেছে। সেখানে গিয়ে আব্বা ঘুরে ঘুরে দোকান পাটগুলো দেখতে লাগলো। তারপর এক সময় আব্বা বললেন কাল থেকে এখানে আমরা একটা কাঁচা মালের দোকান দিবো। আব্বার কাছে মোটামুটি পঞ্চাশ ষাট টাকার মতো ছিলো। তাই দিয়ে পরের দিন থেকে আমরা রাস্তার পাশে খানিকটা জায়গা জুড়ে আলু বেগুন পটল সিম ডাঁটা শাঁক এই ধরনের সব্জির বেচা কেনা শুরু করে দিলাম। আমার তিন নম্বর ভাই নজরুলও আমাদের সাথে কাজ করতে লাগলো।
আব্বা খুব ভোরে উঠে সবার আগেই কাঁচা বাজারে চলে যেতেন। কাঁচা মাল সেই বাজার থেকেই কিনতেন। সে সময় কাচামালের পাইকারী বাজার ছিলো না। গ্রাম থেকে মানুষ ঘাড়ে করে মাথায় করে যে যার মতো কাঁচা সব্জী বিক্রি করার জন্যে বাজারে নিয়ে আসতো। আব্বা তাঁদের কাছ থেকে অপেক্ষাকৃত কমদামে কিনে নিতেন । তারপর দোকান সাজিয়ে বসতেন । আর আমি সকাল নয়টার দিকে আব্বার জন্য নাস্তা নিয়ে হাজির হতাম। মাঝে মাঝে খান সেনারাও বাজার করতো সেখান থেকে। একদিন আমাদের দোকানে আসলো এক খান সেনা বাজারের ব্যাগ নিয়ে তখনও তাঁর উর্দি পরা ছিলো কাধে রাইফেল ঝোলানো ছিলো। সে আমাদের কাজ থেকে ব্যাগ ভরে বাজার নিয়ে যখন চলে যাচ্ছিলো তখন আমি নিজে বললাম; জনাব রূপিয়া ? তিনি বললেন "ভাগ বেটা ইয়ে সবজি হ্যায় ইয়ার।" আমি আর কিছু বললাম না। সে সোজা রাস্তায় চলে গেলো।
Koromcha (চলবে)

Comments
Post a Comment