পোড়া ঢেউটিন ও আমার বাংলাদেশ-১
![]() |
| স্বাধীনতার সৈনিকেরা ১৯৭১ |
দেশ আজ স্বাধীন হয়েছে। আমরা যারপর নাই আনন্দিত। আপামর জনসাধারন আজ আমরা স্বাধীনতার সুফল ভোগ করছি। আমি তখন থাকতাম আমার নানীর বাড়ি রহমতগঞ্জ, সিরাজগঞ্জে। নানা বাড়ি না বলে নানীর বাড়ি বলার কারন। নানীর মুখে শুনেছি আমার নানা তখন বিশ বছর হলো মারা গেছেন। আমার ছোট মামার বয়স যখন দেড় বছর তখন আমার নানা মারা যান। তিনি সিরাজগঞ্জ বি এল হাই স্কুলের একজন প্রখ্যাত শিক্ষক ছিলেন। তাঁর জীবনে তিনি বেশ কয়েকটি ইসলামিক গ্রন্থ রচনা করে গেছেন।
ততোদিনে দেশে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। আমার বয়স তখন ১২ কি ১৩ বছর। আর আমার মা বাবা আর অন্যান্য ভাই বোন সবাই থাকতো সৈয়দপুরে। সৈয়দপুর একটি বিহারি প্রধান এলাকা। আমরা যুদ্ধের সময় রহমতগঞ্জের বাড়ি ঘর খালি করে যা কিছু সংগে নেয়া সম্ভব সাথে নিয়ে পশ্চিমে হাঁটা শুরু করলাম। এবং এক দিনে প্রায় দশ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে এক পরিচিতের বাড়িতে গিয়ে উঠলাম। অবশ্য আমরা লক্ষ্য করলাম তারা সবাই বাক্স পেটরা বাধছে অন্য কোথাও পালিয়ে যাবে বলে। আমাদের পেয়ে বললো ভালই হলো আপনারা আমাদের বাড়িতে নিজের মতো করে থাকেন আর আমরা চললাম অন্যে গাঁয়ে।
মেঝো মামা চাকরী করতেন ওয়াপদায়। সরকারী চাকরী। সিরাজগঞ্জ শহর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। নির্বিচারে গনহত্যা হয়েছে। আমাদের রহমতগঞ্জ গ্রামের আমরা সবাই গ্রাম ছেড়ে পশ্চিমের দিকে যে যার মতো করে পালিয়ে গেছি। কিন্তু আমাদের গ্রামে একজন পীর সাহেব থাকতেন। সবাই গ্রাম ছেড়ে গেলেও তাঁকে বার বার বলা সত্ত্বেও তিনি গ্রামেই থেকে গেলেন। তিনি বলতেন পাক সেনারা আমার কি করবে। আমি তাঁকে দেখেছি। শ্বেত শুভ্র শশ্রুমন্ডিত। তাঁর হাতে সব সময় একটা লাঠি থাকতো আর লম্বা জুব্বা পরতেন। তাঁর মাথায় থাকতো সাদা রংএর পাগড়ি।
এদিকে প্রতিদিন একটা ফাঁকা যায়গায় এসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম দূরে কালো ধোঁয়া আকাশের দিকে উবে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে গোলাগুলির শব্দ বোমার শব্দ যেনো নিত্যদিনকার সাথি হয়ে গেলো। ঐ গ্রামটার নাম ঠিক মনে করতে পারছি না। ইছা ডুমুর বা মিছা ডুমুর গ্রাম এমনি হবে হয়তো নামটা। কেউ জেনে থাকলে আমাকে জানাবেন।
মেঝো মামা দুদিন আগেই তাঁর বেতন তুলে এনেছিলেন। তাই আমাদের খুব একটা কষ্ট পেতে হয়নি। গ্রামের হাটে সব কিছু সস্তা চার আনা হলে এক ঢিমা আঁখের গুড় পাওয়া যেতো। চার আনায় এক কেজি পরিমান রুই মাছ পাওয়া যেতো। আমরা যে বাড়িতে উঠেছিলাম তারা বড় গৃহস্থ্য। মশুরের কলাই বস্তা বস্তা। চাল ডাল তেল সবই মোটামুটি আমাদের দেয়া হয়েছে। কিন্তু পরের জিনিসে লোভ করতে নেই। সেই বাড়ির একজন মাত্র মানুষ আমাদের সাথে থেকে গেছেন।
আমি ছোট মানুষ তাই মাঝে মাঝে আমাকে ফাই ফরমায়েশ খাটতে হতো। মশুরের কলাই থেকে কিভাবে ডাল হবে ? তাই আমাকে এক খালা নিয়ে গেলেন পাশের ঘরে বললেন আসো আমরা মসুরের ডাল বের করি। আমিও উৎসুক ছিলাম কিভাবে কলাই থেকে ডাল হবে। দেখি সেই খালা একটা যাঁতাকল বের করেছেন। একটা পাটের চট মাটিতে বিছিয়ে কেজি দুয়েক মসুর কলাই বের করে আনলেন আর যাঁতা ঘুরাতে শুরু করলেন আর আমাকে দেখিয়ে দিলেন ক্যামন করে যাঁতার ভিতর কলাই দিতে হয়। আর যাঁতা ঘুরানো শিখিয়ে দিলেন। বেশ আনন্দে আনন্দে আমি যাঁতাকল চালাতে লাগলাম। মসুরের ডাল হলো চাল ছিলোই বস্তা বস্তা। বাড়ির মালিক বলে গেছেন যা যা লাগে সব ব্যবহার করবেন আপনারা। আমাদের এই দুর্দিনে তাঁদের এই উপকারের কথা কখনো ভুলবার নয়।
একদিন পরেই খবর শুনলাম আমাদের গ্রামের সেই পীর সাহেবকে খান সেনারা গুলি করে মেরে ফেলে রেখে গেছে। আর এলাকার কুকুরেরা তাঁর লাশ টানাটানি করছে। পরে কেউ কেউ সাহস করে গ্রামে গেছেন আর তাঁর লাশটা মাটি দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন। আমি আর মেঝো মামা সপ্তাহ খানেক পড়ে আমাদের শহরতলির সেই রহমতগঞ্জ গ্রামে গেলাম। আমাদের বাড়ি তেমনি আছে যেমনটা আমরা রেখে গিয়েছিলাম। ভালো করে দেখার পরে জানা গেলো যে ছোট মামার ঘরে বিছানায় আগুন দেয়া হয়েছিলো। বিছানা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে আর দেয়ালে ঝুলানো মশাড়ীটাও পুড়ে গেছে কিন্তু বাঁশের বেড়ায় আগুন ধরেনি। আল্লাহ্ মালুম। আল্লাহই ভালো জানেন ক্যানো বাড়ির ঘরের বেড়ায় আগুন ধরেনি। সন্ধ্যা হয় হয় মামা বললেন চল আর দেরি করা ঠিক হবে না। আমরা মামা ভাগ্নে দুই জনে হাটতে হাঁটতে সেই গ্রামে এসে পৌছুলাম। ততোক্ষনে বেলা ডুবে গেছে আর অন্ধকার পথ। এদিকে মামানী নানী সবাই চিন্তায় হা হুতাশ করছিলেন আমরা এখনো আসছি না ক্যানো?
বাড়িতে পৌঁছুতে পৌঁছুতে তখন রাত ন'টার মতো বেজে গেলো। বাড়ির সবার মনেই স্বস্তি ফিরে এলো। এ কয়েকদিনে আরো বেশ কিছু মানুষ এই বাড়িতে এসে যোগদান করেছেন। লোকসংখ্যা বেড়ে গেছে তাই বাড়িতে মোট তিনটি ঘর ছিলো। ভাগাভাগি করে দেয়া হলো এই দুই ঘরে শুধু মহিলারা আর বাচ্চা কাচ্চারা থাকবে। আর এই একটা ঘর আর বাইরের একটা খানকা ঘরে পুরুষেরা ঘুমাবে। দিন যায় রাত যায় এভাবে প্রায় একমাস এই বাড়িতেই থাকলাম আমরা। এদিকে পাকিস্তান সরকার ঘোষনা করেছে যারা যেখানে চাকরি বাকরি করতেন সেখানে যোগদান করতে। তাই মামা ভয়ে ভয়ে ওয়াপদায় গিয়ে কাজে যোগদান করলেন। আস্তে আস্তে শহরের ভিতর লোকজন যাওয়া আসা শুরু করলো। পাকিস্তানীরা বলছে ভয় নাই তোমাদের। তোমরা চাকরী বাকরী ব্যবসা বানিজ্য সব করো।
একদিন আমি আর আমার এক বড় মামাতো ভাই আমরা একসাথে সিরাজগঞ্জ শহরে গেলাম। তাঁদের একটা লেপ-তোশকের দোকান ছিলো খলিফা পট্টিতে। সেটি দেখা গেলো সম্পুর্ন আগুনে পোড়া। দোকানের পিছন দিকে বেশ খানিকটা যায়গা ফাঁকা ছিলো। সেখানে একটা বড় আম গাছ ছিলো। সেই গাছের আম যে এতোই সুস্বাদু ছিলো তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। আমার ঐ দোকানে যাতায়াত ছিলো তাই বলতে পারছি। দোকানটা ছিলো আমিনুর ভাইয়ের বাবার মানে আমার এক বড় মামার। সেই আম গাছটিও আগুনে পুড়ে গেছে। খুব আফশোস হলো আম গাছটির জন্যে কারন ঐ আম গাছের কোনো চারা কোনো দিন করা হয় নি। আমি ঠিক বলতে পারছি না আমটি কোন জাতের ছিলো। (চলবে)
(আমার লেখায় কোনো ভুল ভ্রান্তি নজরে পড়লে অবশ্যই আমাকে কমেন্টে জানাবেন)

Comments
Post a Comment